ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের নীতি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব: এরদোগান

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের নীতি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভবঃএরদোগান
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্ক চায় তুরস্ক। এ লক্ষে দু’পক্ষের গোয়েন্দা পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি নীতি অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে সমালোচনাও করেন তিনি।

এরদোয়ান বলেন, ইসরাইলের সঙ্গে কখনোই আমরা সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করিনি। বর্তমানে দেশটির শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে আমাদের প্রধান সমস্যা।

শুক্রবার (২৫ ডিসেম্বর) ইস্তাম্বুলে জুমার নামাজ আদায়ের পর তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনি নীতি থেকে প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ আমাদের নেই। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের নীতি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তাদের নির্দয় কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

‘ইসরাইলের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতানৈক্য বা সমস্যা না থাকলে আমাদের সম্পর্ক ভিন্ন হতে পারতো।’ বলেন এরদোয়ান।
তিনি বলেন, ‘ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায় তুরস্ক। আমরা আমাদের সম্পর্ককে একটি ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই।’

যদিও, সম্প্রতি বিভিন্ন খবরে দাবি করা হয়েছে, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ তুরস্ক এবং ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন।
ইসরাইল এবং তুরস্কের ড্রোন এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে সম্প্রতি আর্মেনিয়ার দখল থেকে নার্গোনো-কারাবাখ উদ্ধার করে আজারবাইজান। ইসরাইলি ওয়েবসাইট ওয়ালা জানায়, গেল সপ্তাহের শুরুতে আলিয়েভ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে এরদোয়ানকে আহ্বান জানান এবং বিভিন্ন পরামর্শ দেন।

আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও গেল সপ্তাহে ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আঙ্কারা এবং তেল আবিবের মধ্যকার বিভেদ সংক্রান্ত কিছু বিষয় উত্থাপনের জন্য আহ্বান জানান। বলেন, বাকু দুই মিত্রদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী।
২০১০ সালে ইসরাইল এবং তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। ওই সময় ইসরাইলি নৌবাহিনী তুর্কি ত্রাণবাহী জাহাজে হামলা চালায়। ত্রাণ নিয়ে অবরুদ্ধ গাজায় যাচ্ছিল তুর্কি জাহাজ। এমভি মাভি মারমারা জাহাজে ইসরাইলি হামলায় তুরস্কের ১০ মানবাধিকারকর্মী নিহত হন।

এ ঘটনা তুরস্ক-ইসরাইলের কয়েক দশক পুরনো শান্তিপূর্ণ সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ গণহত্যার জেরে পাল্টাপাল্টি নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে আঙ্কারা-তেল আবিব।

২০১৩ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু ওই নৃশংসতার জন্য ক্ষমতা চান। মাভি মারমারার ক্ষতিগ্রস্তদের ২ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেন। এরপরই তুরস্ক-ইসরাইল সম্পর্কে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।

২০১৬ সালে উভয় দেশ পুনর্মিলনের অংশ হিসেবে আবার রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে। বিভিন্ন সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তুরস্ক-ইসরাইল।

অবরুদ্ধ গাজার মানবিক পরিস্থিতির অব্যাহত অবনতি, দখলকৃত জেরুজালেম এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি নির্মাণসহ ফিলিস্তিনে ইসরাইলের নীতির সমালোচনাও করতে থাকে তুরস্ক।
ফিলিস্তিন সফরে ইসরাইলি বিধিবহির্ভুত কঠোরতার মধ্যে পড়তে হতো বলে অভিযোগ করেন তুর্কি নাগরিকরা। ইসরাইলের অনানুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তননীতি, ভিসা প্রত্যাখ্যান, নিয়মবহির্ভুত আটক এবং কোনো কারণ ছাড়া বিমানবন্দরে দেরি করোনার কারণে ওই অঞ্চলে যাতায়াতকারী হাজার হাজার তুর্কি নাগরিক ভ্রমণে নিরুৎসাহী হন।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি তুরস্কের অবিচ্ছেদ্য সহমর্মিতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু দশক ধরে ফিলিস্তিনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলে আসছে আঙ্কারা। তুর্কি কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলে আসছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবনা অনুযায়ী স্বচ্ছ এবং স্থায়ীভাবে ফিলিস্তিন ইস্যু সমাধান না হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।
১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে পূর্ব জেরুজালেম দখল করে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটির এ দখলদারিত্বকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। তারপরও ১৯৮০ সালে পুরো শহরটিতে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে তেল আবিব।

দাবি করে, স্বঘোষিত ইহুদি রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী এবং অবিচ্ছেদ্য রাজধানী পূর্ব জেরুজালেম। গেল বছর জাতিসংঘ ইসরাইলের এ দখলদারিত্বকে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি ভোগদখল আখ্যা দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের মূল কারণ জেরুজালেম। ১৯৬৭ সালে দখল হয়ে যাওয়া পূর্ব জেরুজালেমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন ফিলিস্তিনিরা।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের লক্ষে তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যাকে ডিল অব সেঞ্চুরি বা শতাব্দীর সেরা চুক্তি বলে অভিহত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিকল্পনা অব্যাহতভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
পরিকল্পনা ঘোষণা অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহু ছিলেন। সেখানে ফিলিস্তিনের কোনো কর্মকর্তা ছিলেন না। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, জেরুজালেম ইসরাইলের অবিচ্ছেদ্য রাজধানী থাকবে।

তুরস্ক এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। আঙ্কারা জানায়, মার্কিন ডিল অব সেঞ্চুরি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে। দখলদারিত্বের নীতি অব্যাহত রেখে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি সম্ভব নয় বলেও জানায় দেশটি।

ট্রাম্পের তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনা জাতিসংঘের প্রস্তাবনার লঙ্ঘন। ওই পরিকল্পনায় ইসরাইল যা চেয়েছে তার অধিকাংশ পূরণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রথম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হিসেবে ১৯৪৯ সালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত তাদের মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য এবং উষ্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল।
২০০৭ সালে অবরুদ্ধ গাজায় আকাশ, স্থল এবং জলপথে অপরোধ আরোপ করে ইসরাইল। নেমে আসে চরম দুর্দশা। পরে তাদের সহায়তায় যায় তুরস্কের ত্রাণবাহী জাহাজ। অবরোধ উপেক্ষার অজুহাতে ইসরাইলি বাহিনী হামলা চালায় জাহাজে।
২০১৩ সালে ওই হামলার জন্য ক্ষমা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পর ২০১৬ সালে দু‘পক্ষের সম্পর্ক পুনরায় জোড়া লাগে। ২০১৮ সালে আবার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

ওই বছর জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা দিয়ে তেল আবিব থেকে সেখানে মার্কিন দূতাবাস স্থনান্তরের সিদ্ধান্ত জানান ট্রাম্প। তার এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গাজা সীমান্তে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছিলেন ফিলিস্তিনিরা। তাদের ওপর নৃশংস হামলা চালায় ইসরাইল। তার জেরে দেশটি থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে তুরস্ক।

মাঝে মাঝে এরদোয়ান এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। তবে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলে ঠিকঠাক।
চলতি বছরের আগস্টে তেল আবিব অভিযোগ করে, অবরুদ্ধ গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে পাসপোর্ট দিয়েছে আঙ্কারা। তুরস্কের এ কার্যক্রমকে খুবই অবন্ধু সুলভ আচরণ আখ্যা দেয় ইসরাইল। একইসঙ্গে তুর্কি কর্মকর্তাদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।

২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনুগত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গাজাকে ছিনিয়ে নেয় হামাস। তারপর থেকে অঞ্চলটিকে অবরুদ্ধ করে ইসরাইল। এ পর্যন্ত অন্তত তিন দফা উপত্যকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে তেল আবিব।

তুর্কি জানায়, হামাস বৈধ রাজনৈতিক দল। তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত।
ইসরাইলের ফিলিস্তিন নীতির সঙ্গে এরদোয়ানের মতানৈক্য থাকলে দু’বছর পর সম্প্রতি তেল আবিবে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছে আঙ্কারা।

চলতি মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে আল মনিটর জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষে ৪০ বছর বয়সী উফুক উলুতাসকে ইসরাইলে রাষ্ট্রদূত হিসেব নিয়োগ দিয়েছে তুরস্ক।

ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের চুক্তির পরই তেল আবিবে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করে এরদোয়ান প্রশাসন।
সূত্র: আল জাজিরা, ডেইলি সাবাহ।