নীরব কূটনীতি; পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর বিরল ফোনালাপ

দক্ষিণ এশিয়ার মিডিয়াতে সম্প্রতি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে নীরব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। কূটনৈতিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বরাত দিয়ে এই সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যে সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশের কারণে দুই পক্ষ তাদের সমস্যাদায়ক সম্পর্ক শুধরে নেয়ার চেষ্টা করছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানের হাই কমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকি ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে বৈঠকে বসেন, যে উদাহরণ খুবই বিরল। এই বৈঠক নয়াদিল্লীতে অনেকের ভ্রু কুঁচকে দিয়েছে, এবং সন্দেহের চোখে তারা ঘটনাপ্রবাহের উপর নজর রাখছে।

বাংলাদেশ সরকার এই বৈঠকে ‘সৌজন্য সাক্ষাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে কিন্তু সূত্র জানিয়েছে যে, এর পেছনে আরও অনেক বিষয় রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস যে, বুধবার ইমরান-হাসিনার যে টেলিফোন আলাপ হয়েছে, সেটা এই বৈঠকেরই ফলাফল।

বিগত বহু বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে উত্তেজনা চলে আসছে। ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়, সে যুদ্ধের তিক্ততা দুই দেশের কেউই এখন পর্যন্ত ভুলতে পারেনি।

বর্তমান সম্পর্কের অবনতির কারণে হলো কয়েক বছর আগে শেখ হাসিনা ওয়াজেদের সরকার ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির বেশ কয়েকজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

পাকিস্তান এ ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবিত বিচার প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিল। তাছাড়া, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান, ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল, ঢাকার বিরুদ্ধে সেই চুক্তি লঙ্ঘনেরও অভিযোগ করে পাকিস্তান। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশসহ তিন দেশই ১৯৭১ সালের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন মামলার প্রক্রিয়ায় যাবে না।

দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এতটা খারাপ পর্যায়ে গিয়েছিল যে, ২০১৬ সালে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সর্বসম্মতভাবে জামায়াতে ইসলামির নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাস করে।

২০ মাস ধরে ঢাকায় পাকিস্তানের নিযুক্ত হাই কমিশনারের অনুমোদন দিতে অস্বীকার করে বাংলাদেশ সরকার। ইসলামাবাদকে এক পর্যায়ে এসে ঢাকার জন্য ইমরান আহমেদ সিদ্দিকিকে নতুন হাই কমিশনার হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব দেয়। গত বছরের নভেম্বরে শেষ পর্যন্ত ঢাকা তার নিয়োগকে অনুমোদন দেয়। জানুয়ারিতে ঢাকার পাকিস্তানী মিশনে যোগ দেন সিদ্দিকি।

বিরল টেলিফোন আলাপ

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রী বুধবার টেলিফোনে কথা বলেছেন। দুই দেশের কূটনীতির ক্ষেত্রে এটা বিরল অগ্রগতি, বিশেষ করে যখন দুই দেশই নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, “পারস্পরিক আস্থা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক গভীর করার ব্যাপারে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”। প্রধানমন্ত্রী খানের অফিস থেকে দেয়া বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী খান এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান।

মহামারীতে নিহতদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় বাংলাদেশে প্রাণ ও সম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, সে জন্য তিনি তার সমবেদনা জানান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব যাতে বাংলাদেশের মানুষ দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে, সে জন্য প্রার্থনা করেন তিনি।

সার্কের প্রতি পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে ইমরান টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য দুই দেশের একত্রে কাজ করার উপর গুরুত্ব দেন।

তিনি ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাপারে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে জম্মু ও কাশ্মীর বিবাদের মীমাংসার উপর গুরুত্ব দেন।

সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন

ইসলামে সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপকারী সাহাবি হজরত সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.

তিনি বিশিষ্ট সাহাবি হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। হিজরতের ২৩ বছর আগে ৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে কোরাইশের বনু যোহরা গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা হামনা। যেহেতু তাঁর নানীর বংশ নবীজির বংশপরম্পরায় যোহরা বংশে ছিল, সে হিসেবে নবীজি (সা.) তাঁর মামা হন। নবীজি (সা.) অনেকবার নিজেও এই আত্মীয়তার কথা স্বীকার করেছেন।

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি তিনি। ইসলামের সূচনালগ্নে তৃতীয় বা চতুর্থ নম্বরে ইসলাম গ্রহণ করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। ইসলাম গ্রহণের খবর তাঁর মা জেনে গেল। সে ছিল চরম ইসলামবিদ্বেষী। তাই তাঁর ইসলাম গ্রহণে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল।

এমনকি পানাহার ছেড়ে দিল। আর বলল, তুমি যদি এই ধর্ম থেকে ফিরে না আস, তাহলে আমি পানাহার করব না। তার এ অভিমান ছিল সাদের জন্য কঠিন পরীক্ষা। তিনি ছিলেন মায়ের অনুগত সন্তান।

কিন্তু ঈমানকে মায়ের ভালোবাসার উপর অগ্রাধিকার দিলেন। অটল থাকলেন ইসলামের ওপর। মাকে লক্ষ করে বললেন, মা আমার! আপনার যদি হাজারটা প্রাণ থাকে। আর হাজারবার এ ধরনের কসম করেন, তারপরেও আমি আমার ধর্ম থেকে ফিরে আসতে পারব না।

আল্লাহপাক খুিশ হয়ে তাঁর ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল করলেন, ‘যদি তারা আমার সাথে এমন বিষয়ের শরিক করার জন্য বল প্রয়োগ করে যার তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করো না আর দুনিয়াতে তাদের সাথে সৎভাবে সাহচর্য অবলম্বন কর।’ (সূরা লুকমান, আয়াত : ১৫)

ইসলাম গ্রহণ করার পর হিজরত পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করেন। কিন্তু মক্কার জমিন তাঁর জন্য সঙ্কুচিত হয়ে আসে। চলতে থাকে কাফের মুশরিকদের অবর্ণনীয় নির্যাতন।

মক্কায় কাফের মুশরিকদের জুলুম অত্যাচারে যখন মুসলমানগণ অতিষ্ঠ হয়ে গেলেন। ভেঙ্গে গেল ধৈর্যের বাঁধ। তখন নবীজি (সা.) মুসলমানদেরকে মদিনা শরিফে হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। হজরত সাদ (রা.)ও নবীজির আদেশ শুনে চলে গেলেন মদিনায়।

তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামে তীর নিক্ষেপ করেন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে রাসূল (সা.) কোরাইশদের গতিবিধি লক্ষ করার জন্য ৬০জন সাহাবির একটি টহলদল হিজাযের উপকলীয় নগরীতে পাঠান। সাদ (রা.) ছিলেন এ টিমের অন্যতম সদস্য।

এ টহলদল ইকরিমা বিন আবু জাহেলের নেতৃত্বে কোরাইশদের একটি কাফেলাকে দেখতে পান। কোরাইশদের কেউ চিৎকার করে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে হজরত সাদ (রা.) তীর নিক্ষেপ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই কাফেরদের বিরুদ্ধে কোনো মুসলমানের ছোড়া প্রথম তীর।

দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) মৃত্যুর প্রাক্কালে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য যে ছয়জন শূরা কমিটি গঠন করেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের একজন। রাসূল (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! সাদ যখন তোমার কাছে দোয়া করে তুমি তার দোয়া কবুল করো।’ (ইবনে হিব্বান : ৪৫০)

তিনি ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে নবীজি (সা.) এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদর যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত বীরত্বের পরিচয় দেন। জীবন বাজী রেখে অবতীর্ণ হন তুমুল যুদ্ধে। সাঈদ ইবনে আস সারাখিল কাফেরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন।

ঐ কাফেরের যুল কাতিফা নামে একটি তরবারি তাঁর পছন্দ হওয়ার কারণে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু গনিমতের বিধান তখনো নাজিল হয়নি এজন্য এটা যেখান থেকে আনা হয়েছিল সেখানে ফেরত দিতে বলা হয়।

এ যুদ্ধে হজরত সাদ (রা.) এর ভাই হজরত উমাইর (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ভাইয়ের শাহাদাত এবং তরবারিটি রাখতে না পারার কিছুটা কষ্ট হয়েছিল। আল্লাহ পাক তরবারির ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সূরা আনফাল নাজিল করলেন। তারপর রাসূল (সা.) তাকে ডেকে তরবারি নিয়ে আসার অনুমতি দিয়ে দেন।

তৃতীয় হিজরিতে উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানদের পদসমূহ প্রকম্পিত হয়ে গিয়েছিল। আর সবাই নবী (সা.)-কে ছেড়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি দশ জনের চেয়ে কম লোক রাসূলের পাশে রইল তখন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) তুনীর নিয়ে রাসূলকে রক্ষা করতে লাগলেন। প্রত্যেকটি তীরের আঘাতে তিনি একেকটা কাফেরকে হত্যা করতে লাগলেন।

রাসূল (সা.) তাঁকে এমনভাবে তীর নিক্ষেপ করতে দেখে উৎসাহ দিয়ে বললেন, সা‘দ! তুমি তীর ছুঁড়ে মার আমার পিতা ও মাতা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক, তুমি তীর ছুঁড়ে মার।

এক কাফের মুসলমানদেরকে যুদ্ধে খুব পেরেশান করে রাখছিল নবীজি (সা.) তাকে নিশানা বানাতে নির্দেশ করলে তিনি তীরের ফলা ছিল না অথচ এমন একটি তীর ঐ কাফেরের কপাল বরাবর মেরে দেন। কাফের লোকটি সাথে সাথে জমিনে লুটে পড়ল। চলে গেল সোজা জাহান্নামে। নবীজি (সা.) তাঁর এই তীরন্দাজি দেখে হেসে ফেললেন। এমনকি তাঁর দাঁত দেখা গিয়েছে।

উহুদ, খন্দক, হুদায়বিয়া, খায়বারসহ সব যুদ্ধেই তিনি বিরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। মক্কা বিজয়ের পরেও হুনায়ন যুদ্ধে রেখেছেন কঠিন ভূমিকা।

তায়েফ এবং তাবুকের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। হজরত ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে ঐতিহাসিক কাদেসিয়ার যুদ্ধেও পালন করেন সেনাপতির দায়িত্ব। দশম হিজরিতে নবীজি (সা.) বিদায় হজ্বের ইচ্ছা করলে তিনিও নবীজির সঙ্গী হন। কিন্তু মক্কায় গিয়ে তিনি অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

মদিনার প্রতি হজরত সা‘দ (রা.) এর এত ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছিল যে, মক্কাতে মৃত্যুবরণ করাও ছিল অপছন্দের। অসুস্থতা যতই বাড়ছিল ততই বাড়ছিল তাঁর পেরেশানিও। রাসূল (সা.) তাঁর এই পেরেশানি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে তোমার? তিনি আরজ করলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের মহব্বতে যে দেশ ত্যাগ করেছিলাম, সেখানেই আবার মৃত্যু হয়ে যায় কিনা!

নবীজি (সা.) তাকে সান্ত¦না দিলেন এবং তার কপালে হাত রাখলেন। এরপর হাতের স্পর্শ মুখমÐলের ওপর দিয়ে বুলিয়ে পেট পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আর এভাবে তার জন্য দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি সা‘দকে সুস্থ করে দাও! হে আল্লাহ! তুমি সা‘দকে সুস্থ করে দাও! তার হিজরতকে পূর্ণতা দাও এবং তাঁর হিজরতের স্থান মদিনাতেই তাঁর মৃত্যু দাও।’

রাসূলের দোয়া পেয়ে সুস্থ হয়ে গেলেন সা‘দ। সাথে সাথে নবীজি (সা.) তাঁকে এই সুসংবাদও দিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার থেকে এক কওমের উপকার এবং অপর আরেক কওমের ক্ষতি না হবে, ততক্ষণ তুমি মৃত্যুবরণ করবে না। রাসূলের এই ভবিষ্যদ্বাণী অনারবদের দেশগুলো।