লাদাখে আবারও ভারী অস্ত্রসহ ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে চীন

ছবি: সংগৃহিত

ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভি দাবি করেছে, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও লাদাখের নিয়ন্ত্রণ রেখার সব এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করেনি চীন। দেপসাং মালভূমি, গোগরা এবং ফিঙ্গারস অঞ্চলে এখনও চীনা সেনাদের উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি তাদের।

তবে গালওয়ান, হট স্প্রিং এবং ফিঙ্গারস অঞ্চলের কয়েকটি এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। নিজস্ব সূত্রের বরাতে সম্প্রচারমাধ্যমটি জানিয়েছে, ভারী অস্ত্রসহ প্রায় ৪০ হাজার সেনা ওই এলাকায় মোতায়েন রেখে রেখেছে চীন।

গত ১৫ জুন লাদাখ সীমান্তের গালওয়ান উপত্যকায় চীন ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘাতের পর কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে বেশ কয়েক দফায় আলোচনা করেছে উভয় পক্ষ। এসব আলোচনায় নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হওয়ার পাশাপাশি দুই দেশই এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানায়।

সর্বশেষ গত ১৪ ও ১৫ জুলাই দুই দেশের সেনা পর্যায়ের আলোচনায় পারস্পারিকভাবে সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। তবে তারপরে আর কোনও অগ্রগতি হয়নি।

এনডিটিভি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ রেখার গোগরা কিংবা দেসপাং মালভূমি থেকে চীনের সেনা প্রত্যাহারের কোনও লক্ষণ নেই। এছাড়া নিজেদের দখলে রাখা ফিঙ্গারস-৪ ও ফিঙ্গারস-৮ এলাকা থেকেও সেনা প্রত্যাহার করতে চাইছে না চীন।

একটি সূত্র এনডিটিভিকে জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ রেখার বিভিন্ন অংশে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক যান ও দূর পাল্লায় গোলাবর্ষণকারী সরঞ্জামসহ প্রায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে চীন। আরেকটি সূত্র অভিযোগ করেছে, নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে না চীন।

আরো পড়ুন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম কেড়ে নেবে চীন-ইরান চুক্তি

ইরান প্রভাবশালী বৃহৎ শক্তির জন্য জটিল অংশীদারিত্ব গড়লেও সমান অংশীদারিত্বে সহজাত মিত্র। ভারত সম্পর্কে ইরান সবচেয়ে বেশি যে আকাঙ্ক্ষাটি পোষণ করত, তা হলো তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। ভারত যখন বদলে গেল, তখন সম্পর্কও বদলে গেল।

কঠিন বাস্তবতা হলো এই যে ওই সম্পর্কের সর্বোত্তম সময়টি হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকে যখন ইসরাইলের সাথে ভারতের সম্পর্কের সূচনা হয় এবং অপ্রত্যাশিত যুক্তরাষ্ট্র-ভারতীয় ‘সোভিয়েত-পরবর্তী’ সম্পর্ক।

তবে তেহরান কখনো অতীতের ক্রোধ ধারণ করে রাখেনি।ইরানের মূল স্বার্থে আঘাত না করা বা বর্গিদের আক্রমণ করার সুযোগ না দেয়া পর্যন্ত পারস্পরিক আস্থা অক্ষুণ্ন ছিল। ইরান এর প্রতিদান দিয়েছে। ওটাই ছিল সেরা সময়।

এ কারণে ভারতের উচিত হবে আসন্ন সাইনো-ইরানিয়ান কম্প্রেহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ নামে অভিহিত ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তিটি পরীক্ষা করা। তবে চোখে যতটা দেখা যায়, তার চেয়েও বেশি কিছু আছে। বেইজিং এমনকি ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথেও ব্যাপকভিত্তিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে।

ধারণা করা হচ্ছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও সিনিয়র ভাইস-প্রিমিয়ার হ্যান ঝেং সৌদি আরবের সাথে অংশীদারিত্ব আলোচনা চালাচ্ছেন। আর পলিটব্যুরো সদস্য ইয়াং জেচি সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাথে আলোচনা করছেন।

এই ইয়াং আবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পররাষ্ট্র বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, রিয়াদ ও আবু ধাবির সাথে অংশীদারিত্বকে বেইজিং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

চীনের প্রিয়ভাজন কেউ নেই। স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্টতা ও দীর্ঘ মেয়াদি সম্ভাবনার আলোই চীনের আঞ্চলিক নীতি নির্ধারিত হয়। পারস্য উপসাগরে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করতে চায় চীন। চীনের কৌশলগত তেল রিজার্ভ গড়ে তোলার জন্য সৌদি আরব হলো পছন্দের অংশীদার।

তবে এই অঞ্চলে চীনের সম্প্রসারণশীল প্রভাবের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও দরকার। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে চীনের পছন্দ করার কারণ এটি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পরিবহন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে থাকার কারণেই নয়, বরং সেইসাথে সাহসী নতুন দুনিয়ায় প্রবেশের আকাঙ্ক্ষী হওয়ার কারণেও।

আমিরাতের রাষ্ট্রীয়-পরিচালিত টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানিগুলো হুওয়েইকে তাদের ৫জি সেলুলার নেটওয়ার্ক চুক্তি দিয়েছে। চীনের বাইরে বৃহত্তম কোভিড-১৯ পরীক্ষা স্থাপনা আবু ধাবিতে অবস্থিত।

এটি চীনা জিনোমিক্স কোম্পানি বিজি১ ও আমিরাতের আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ জি৪২-এর যৌথ উদ্যোগ। আমিরাতি কোম্পানিটি দেশটির রাজপরিবারের সাথেও সম্পর্কিত।

ইরানের দিকে নজর ফেরানো যাক। আমেরিকান অবরোধ ও মহামারির কারণে দেশটি এখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রয়েছে। দেশটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) একীভূত হলে লাভবান হতে পারবে।

চীনের সাথে প্রস্তাবিত ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির ফলে শত শত প্রকল্প চালু হবে। এটি ইরানের ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও অবকাঠামো চাহিদা পূরণ করবে, চীনা কোম্পানি ও টেক জায়ান্টদের বাণিজ্যিক স্বার্থ পূরণ করবে। বিআরআইয়ের যোগান দেয়া পুঁজি ইরানের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ব্যবধান পূরণ করবে, পরিবহন ব্যবস্থা, তেল, গ্যাস ও পেট্রোক্যামিলেক খাত এবং বন্দর ও শিল্প জোনের জন্য প্রবৃদ্ধির নতুন ভেন্যু খুলে দেবে।

ইরানের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বে সীমাহীন সম্ভাবনা দেখছে চীন। দেশটি সস্তা তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিপুল পরিমাণে যোগান দিতে পারবে, তার বাজারও রয়েছে। এই ভূ-কৌশলগত ভারসাম্যে উভয়েই লাভবান হবে।

সংক্ষেপে বলা যায়, চীনের ইরান নীতির পেছনে রয়েছে পারস্য উপসাগরে তার ক্রমবর্ধমান অবস্থান সৃষ্টি। চীন এই অঞ্চলে বিভিন্ন খেলোয়াড়ের সাথে বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তবে এই সম্পর্ক গড়ে তোলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার বৈশ্বিক সঙ্ঘাতের বিষয়টিও মাথায় রেখেছে।

প্রস্তাবিত চীন-ইরান চুক্তির একটি অংশও যদি বাস্তবায়িত হয়, তবেই ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হতে পারে। চীন তার অর্থনৈতিক প্রভাবকে রাষ্ট্রযন্ত্রে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে। আর ইরানে সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরে জাতিসঙ্ঘ অবরোধ অক্টোবরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বিআরআইয়ে ইরানের সংযু্ক্তি মানে সিপিইসির সাথে তার সংযুক্তি। আর সিপিইসির মাধ্যমে ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ক গড়ে ওঠবে। গত সপ্তাহে চীন তার ভাষায় ‘চীন+মধ্য এশিয়া’ (সি+সি৫) নামে অভিহিত আঞ্চলিক ফোরামের সূচনা করেছে।

সি+সি৫ মন্ত্রীরা- কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান- ১৬ জুলাই এক ভিডিও কনফারেন্সে একমত হয়েছে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে, বিনিয়োগ সহযোগিতা করতে ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে পরস্পরের সহযোগী হতে।

বিআরআই অর্থনৈতিক করিডোর চীনকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সাথে চীনকে সংযুক্ত করবে এবং এর ফলে চীনের ‘মালাক্কা ডেলিমা’ বেশ শিথিল হবে। তবে চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারিত্বের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল অংশ হচ্ছে তাদের পরিকল্পিত পণ্য বিনিময়ে ইউয়ানের ব্যবহার। এরতে করে তাদের অংশীদারিত্ব পাশ্চাত্যের ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এড়িয়ে যেতে পারবে।

কোনো জ্বালানি পরাশক্তি যখন বিশ্বের এক নম্বর জ্বালানি খেকোর সাথে ই্উয়ান মুদ্রায় লেনদেন করবে, তখন তা নিশ্চিতভাবেই বড় খবর হবে। পাশ্চাত্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্তম্ভ পেট্রোডলার বড় ধরনের ঝাঁকি খাবে, এবং এর প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিতেও পড়বে। ফলে ওয়াশিংটন এখন তেহরানকে মরিয়াভাবে আলোচনার টেবিলে দেখতে চাইবে। ইরানে দফায় দফায় বোমা বিস্ফোরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীন-ইরান সম্পর্ক ভারতের কূট্নীতিতে কোথায় ভুল আছে, তা নির্দেশ করছে। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তেরান সফর করেছিলেন। তাদের সফরটি হয়েছিল ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির প্রেক্ষাপটে। চীনা কূটনীতি