বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান

বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করার লক্ষ্যে নীরবে প্রয়াস শুরু করেছে পাকিস্তান। এই অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, বর্তমান আঞ্চলিক পরিবেশ ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে নতুন করে সম্পর্ক সৃষ্টির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উত্তেজনাকর রয়েছে। দুই দেশ এখনো বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়া ১৯৭১ সালের ঘটনাবলীর তিক্ত স্মৃতি থেকে মুক্তি পায়নি।

কয়েক বছর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের কয়েকজন নেতার বিচার ও ফাঁসি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিলে দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমান নিম্ন পর্যায়ে উপনীত হয়।

পাকিস্তান এ ধরনের উদ্যোগকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে অভিহিত করে। পাকিস্তান আরো অভিযোগ করে, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের সাথে যে ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছিল, এটি তার বরখেলাপ। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য কারো বিরুদ্ধে মামলা না করার জন্য বাংলাদেশসহ তিন দেশ রাজি হয়েছিল।

জামায়াতে ইসলামি নেতাদের মৃত্যুদণ্ডকে নিন্দা জানিয়ে ২০১৬ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সর্বসম্মত প্রস্তাবের পর দুই দেশের সম্পর্কের আরো অবনতি হয়।

বাংলাদেশ সরকার কেবল ২০ মাস পর্যন্ত পাকিস্তানি হাই কমিশনারের নিয়োগ অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত থাকেনি, শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদকে ঢাকার হাই কমিশনার হিসেবে ইমরান আহমদ সিদ্দিকিকে নিয়োগ করার নতুন প্রস্তাবও দিতে হয়েছে। নভেম্বরে ঢাকা অবশেষে তার নিয়োগ অনুমোদন করে। সিদ্দিকি জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তান মিশনে যোগ দেন। এতে দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়।

চলতি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানি দূত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সাথে বিরল এক বৈঠক করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এই সভাকে বিরাট সাফল্যময় বা দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলার ইঙ্গিত বলতে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে।

তবে ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পাকিস্তানের হাই কমিশনারের বৈঠকে সতর্কতা প্রকাশ করে দাবি করে যে ভারত অন্যান্য ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগটি পাকিস্তান গ্রহণ করার চেষ্টা করছে।

নয়া দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তা আরো গভীর হয় ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর। বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব রয়েছে এবং পাকিস্তানের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের অবিশ্বাসের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছে।

তবে ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় ধরনের আঘাত সৃষ্টি হয় গত বছর মোদি সরকার যখন বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে। এই আইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মার্চে বিশাল প্রতিবাদ হয়। ভারতবিরোধী ভাবাবেগ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকায় মোদিকে তার সফর বাতিল করতে হয়।

এদিকে অর্থনৈতিক ও অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে চীনও। ঢাকা ইতোমধ্যেই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হয়েছে। বিনা শুল্কে চীনে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানির সুযোগ দিয়েছে চীন। একইভাবে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সহায়তা করছে।

এই সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশ সম্প্রতি ভারত ও চীনের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনায় নীরবতা অবলম্বন করে। ঢাকা লাদাখ অঞ্চলে চীনের সাথে রক্তাক্ত সঙ্ঘাতে এক কর্নেলসহ ভারতের ২০ সৈন্য নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেনি।

পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে বিব্রতকর সম্পর্ক ঝালাই করে নেয়ার ভালো সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তান চায় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে। তিনি অবশ্য বলেন, এটি অন্য কোনো দেশকে লক্ষ্য করে হবে না।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও সাউথ এশিয়ান মনিটর