কাশ্মীরিদেরকে স্বাধীনতালাভে উজ্জীবিত করছে তুর্কি টিভি সিরিজ এরতুগ্রুল

জনপ্রিয় তুর্কি টেলিভিশন সিরিজ ইরতুগ্রুল, ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরিদের কাছে করণোভাইরাস মহামারীর মধ্যে তাদের প্রতিদিনের দুর্ভোগে তাদের মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলেছে বলে মনে করেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ইরতুগ্রুল নিয়ে আনাদুলু এজেন্সী ও সাউথ এশিয়ান মনিটরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ইনকিলাব পাঠকদের জন্য বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ আবদুল অদুদ।

সিরিজের প্রতি খেয়াল করলে দেখবেন, ২৭ বছর বয়সী ব্যবসায়িক শিক্ষার্থী আবু বকর আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, এটি আমার মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে যে, আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন আমাদের দুর্দশাও শেষ হয়ে যাবে।

ইরতুগ্রুল কাশ্মীরিদের ভারতীয় বর্বরতার মাঝে আশা জাগিয়ে তুলেছে: বকর গত মাসে ডিসিলিস এরতুগ্রুলের পাঁচটি মরসুম শেষ করেছেন। তবে ধর্মীয় আবেদন এবং দৃঢ বার্তার কারণে এটি আবার দেখেছেন যে: বিজয় আমাদের নয়, এটি আল্লাহর।

আমি একজন নিপীড়িত মুসলমান হিসাবে এই সিরিজের সাথে দৃঢ়তার সাথে সংযোগ নিচ্ছি। সিরিজটি আমার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্নভাবে অনেকটা কার্যকর। এটিতে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবেদন রয়েছে বলে বকর উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ শতাব্দীর আনাতোলিয়া, বর্তমানে আধুনিক তুরস্কে প্রতিষ্ঠিত ডিরিলিস এরতুগ্রুল, মুসলিম তুর্কিদের কাহিনী, খ্রিস্টান বাইজেন্টাইনদের সাথে লড়াই করে, মঙ্গোল এবং ক্রুসেডারদের আক্রমণ করে গল্প অবলম্বনে নির্মিত।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমান প্রথম জনকের যোদ্ধা ও পিতা এরতুগ্রুল গাজীর সমন্বিত এই সিরিজটিতে তুর্কি উপজাতির দুই হাজার লোকের একটি সংখ্যালঘু দলের কাইয়ের লড়াই, স্বৈরাচার, নিপীড়ন, কষ্ট, পরিচয় এবং ন্যায়বিচারকে চিত্রিত করা হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানের গবেষক মনুন আক্তার আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, এই সিরিজটি কাশ্মীরে ভাল মানায়। এখানে পরিস্থিতি সিরিজের চিত্রিত ঘটনার মতই। এটি মনে হয় এরতুগ্রুল গাজীর মতো আল্লাহর প্রেরিত মানুষ কাশ্মীরে নিপীড়ন, অবিচার ও অত্যাচারের অবসান ঘটাতে এসেছেন।

কাশ্মিরিরা এরতুগ্রুলকে দেখার সাথে সাথে একটি ‘কণ্ঠস্বর’ প্রত্যাশা করেছে : অঞ্চলটির বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, এই সিরিজটি একটি সংবেদন হিসেবে পরিণত হয়েছে। কারণ, এটি কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত ও নিপীড়িত বাসিন্দাদের সান্তনা দেয়, যখন তাদের মধ্যে একটি আওয়াজের ‘আশা’ জাগায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নূর মোহাম্মদ বাবা বলেছেন, কয়েক দশক ধরে কাশ্মীরিদের জন্য মৃত্যু ও ধ্বংস একটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং দিরিলিস এরতুগ্রুলের মতো একটি সিরিজের মধ্যে লোকেরা এর বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় এটি আরও বেশি প্রভাব ফেলেছে।

বাবা আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, কাশ্মীরে এর বিশাল জনপ্রিয়তার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ১.এর বিষয়বস্তু কাশ্মীরের সাথে সম্পর্কিত, ২. সাংস্কৃতিক আবেদন সেখানে রয়েছে এবং ৩. এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামিক মূল্যবোধকে বিশ্বাস করে।

গত ডিসেম্বরে যখন জনপ্রিয় তুর্কি সিরিজটি কাশ্মীরে যাত্রা করেছিল, তার চার মাস পরে ভারত সরকার এই অঞ্চলের বিশেষ মর্যাদাকে সরিয়ে দিয়েছিল এবং কঠোর সামরিক ও যোগাযোগের জট বাঁধতে বাধ্য করেছিল।

এই সময়টিতেই বাইরে থেকে কাশ্মীরিরা পেনড্রাইভ এবং ফোনে সিরিজটি কাশ্মীরে নিয়ে আসে। যাইহোক, বর্তমান মহামারী সংকটে, এপ্রিল মাসে পাকিস্তান উর্দু ভাষায় ডাবিং করায় সিরিজের জনপ্রিয়তা নতুন উচ্চতায় বেড়েছে।

কাশ্মীরিরা স্বাধীনতার প্রত্যাশায় তাদের নবজাতকের নাম এরতুগ্রুল রাখেন : তুর্কি সিরিজের ঝড় এমন যে, অনেক পিতা-মাতা তাদের নবজাতক এরতুগ্রুলের নাম রাখছেন। দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার এক দম্পতি সম্প্রতি এক ছেলের নাম ইরতুগ্রুল রাখেন, এই জুটির আট বছরের কন্যা নামটি প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ, তিনি এই সিরিজের ডাই-হার্ড ভক্ত।

নবজাতকের মা নাজিশ আক্তার আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, আমার কন্যা এই সিরিজের প্রতি আরও আগ্রহী। যখন আমি প্রসবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিছিলাম, আমার বর আমাকে বলেছিলেন যে, আমাদের যদি একটি বাচ্চা ছেলে হয়, তবে আমরা তার নাম রাখব এরতুগ্রুল এবং আমরা তার নাম এরতুগ্রুল রেখেছি।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, কাশ্মীরের নবজাতকের ক্ষেত্রে এরতুগ্রুল প্রায়শই মুখরিত নাম।পরামর্শদাতা শিশু বিশেষজ্ঞ সুহেল নায়েক বলেছেন, গত চার মাস ধরে তিনি অনেক বাবা-মা তাদের বাচ্চাদের নাম এরতুগ্রুলের নাম দেখেছেন।

নায়েক বলেন, এটি এখানকার বাসিন্দাদের উপর সিরিজের প্রভাবের কথা জানান দেয়।

কাশ্মীর: একটি বিতর্কিত অঞ্চল: কাশ্মীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হিমালয়ান অঞ্চল, ভারত এবং পাকিস্তানের কিছু অংশে অধিষ্ঠিত এবং উভয়ই ভূখন্ডটির দাবী করে। কাশ্মীরের একটি ছোট স্লাইভারও চীন ধরে আছে।

১৯৪৭ সালে বিভক্ত হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের তিনটি যুদ্ধ হয়েছে- ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালে, যার দুটি যুদ্ধ হয়েছে কাশ্মীর নিয়ে।

এছাড়াও, উত্তর কাশ্মীরের সিয়াচেন হিমবাহে, ভারত ও পাকিস্তানি সেনারা ১৯৮৪ সাল থেকে মাঝেমধ্যে যুদ্ধ করেছে। ২০০৩ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীরের কিছু কাশ্মীরি গোষ্ঠী স্বাধীনতার জন্য বা প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে একীকরণের জন্য ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে।

বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, ১৯৮৯ সাল থেকে এই সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রেললাইনের পর এবার গ্যাস চুক্তি থেকেও ভারত কে বাদ দিয়ে দিলো ইরান

ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে একের পর এক সরে আসছে ইরান। গত সপ্তাহে ইরানের চাবাহার বন্দরের রেলওয়ে সংযোগ পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়ার পর, এবার দেশটির একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র প্রকল্প হারাতে চলেছে ভারত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ‘ফারজাদ- বি’ গ্যাসক্ষেত্রটি ইরান নিজেদের অর্থায়নেই উন্নয়ন করবে বলে জানিয়েছে। তবে ভারত পরবর্তী ধাপের উন্নয়নে অংশ নিতে পারে। বৃহৎ ওই গ্যাসক্ষেত্রটি খনন ও উন্নয়ন নিয়ে গত ১০ বছর থেকেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করছিল নয়াদিল্লি।

২০১৬ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তেহরান সফরের সময় ইরানের চাবাহার সমুদ্রবন্দর থেকে আফগানিস্তান সীমান্ত লাগোয়া ইরানি শহর জাহেদান পর্যন্ত ৬২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন নির্মাণের জন্য ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যে ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছিল তা থেকে এর আগে বাদ পড়ে ভারত।

গত সপ্তাহে ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানি এনআইওসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্যাসক্ষেত্রটির উন্নয়ন ও পরিচালনায় ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের কথা জানান। সমালোচকরা বলছেন, এটা ভারত মার্কিন ঘনিষ্ঠ আর ইরান চীনঘনিষ্ঠ হওয়ার ফল।

এরদোগানের হুঁশিয়ারি

লিবিয়াতে মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তৎপরতার নিন্দা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। হাফতারকে সহায়তায় মিসর যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা সবই অবৈধ বলে সাব্যস্ত করেন তিনি এবং আরব আমিরাতের আচরণকে দস্যুতার সাথে তুলনা করেন।

এর আগে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি রাজধানী কায়রোতে লিবিয়ার বেনগাজির উপজাতি নেতাদের সাথে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি লিবিয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জিএনএ সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে লিবিয়া ইস্যুতে মিসর চুপ করে বসে থাকবে না।

তবে এমন হুমকিকে যুদ্ধের উসকানি হিসেবে দেখছে জিএনএ সরকার। একইসাথে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, উপজাতি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দিয়ে লিবিয়াকে আরো অস্থিতিশীল করতে চাইছে মিসর। লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে সিসির এমন মন্তব্যকে লিবিয়ার আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপরই তুর্কি প্রেসিডেন্ট এমন নিন্দা জানালেন।

লিবিয়া যুদ্ধে দেশটির জিএনএ সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক। অপর দিকে মিসর, আরব আমিরাত ও রাশিয়া এর শত্রুপক্ষ বিদ্রোহী নেতা জেনারেল খলিফা হাফতারের দলকে সমর্থন দিচ্ছে। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করেন খলিফা হাফতার। সম্প্রতি তুরস্ক জিএনএ সরকারের সমর্থনে লিবিয়ায় সেনা পাঠালে চাপের মুখে পড়ে বিদ্রোহীরা। বেশ কিছু শহর আবার দখলে নিতে সক্ষম হয় জিএনএ সরকার।

এ কারণে এ সপ্তাহে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী সরকার মিসরকে এ যুদ্ধে অংশ নেয়ার আহ্বান জানায়। এ প্রেক্ষাপটে এরদোগান বলেন, মিসর লিবিয়ায় প্রবেশ করলেও জিএনএকে সহায়তা চালিয়ে যাবে তুরস্ক। তা ছাড়া গত মাসে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আলসিসি বলেন,

মধ্যাঞ্চলীয় সির্তে-জুফরা মহাসড়কে ত্রিপোলি সরকার ও তুর্কি সৈন্যরা আবার আক্রমণ চালালে মিসরের সৈন্যরা লিবিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। উল্লেখ্য, ওই মহাসড়কটি লিবিয়ার প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্রগুলোর প্রবেশপথ মনে করা হয়। আর এসব কেন্দ্র এখন হাফতার বাহিনীর দখলে রয়েছে।

তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় ২০১১ সালে পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে কর্নেল ময়াম্মার গাদ্দাফির পতনের মাধ্যমে। তারপর থেকে লিবিয়ায় চলছে সীমাহীন সঙ্ঘাত। গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার পর ত্রিপোলিতে জাতিসঙ্ঘ সমর্থিত একটি মনোনীত সরকার রয়েছে। ওই কর্তৃপক্ষকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বা জিএনএ নামে অভিহিত করা হয়। তবে দেশের বিরাট অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে রয়ে গেছে।

পশ্চিমাঞ্চলে জিএনএ-এর কর্তৃত্ব থাকলেও পূর্ব ও দক্ষিণের বেশির ভাগ অঞ্চল হাফতার বাহিনী কবা এলএনএ-এর দখলে। ত্রিপোলির জাতিসঙ্ঘ স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক, ইতালি ও ব্রিটেন। আর হাফতার বাহিনীর সমর্থনে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া, ফ্রান্স, মিসর ও সৌদি আরব।

লিবিয়ার তেল সম্পদের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন হাফতার। তাই এর দখলে অভিযান চালাচ্ছে তুরস্ক ও জিএনএ সরকার। চাপে রয়েছেন হাফতারও। আর একটি অঞ্চল হারালেও অনেকখানি তেলের দখল পেয়ে যাবে লিবিয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকার।

এ জন্য লিবিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে মোকাবেলায় দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে মিসরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হাফতার বাহিনী। মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এ বাহিনী ইতোমধ্যে দেশটির পূর্বাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকার দখল নিতে সমর্থ হয়েছে।

সেখানে নিজস্ব স্টাইলে পার্লামেন্টও স্থাপন করা হয়েছে। লিবিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি তুরস্কের সমর্থন মোকাবেলায় মিসরের সামরিক হস্তক্ষেপ অনুমোদনের একটি প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে হাফতারের পার্লামেন্ট।