মহাসাগরে পাক-চীন যৌথ হুমকির মুখে ভারত

ভারতের জন্য স্থল সীমান্তের পর এবার চীন-পাকিস্তানের সম্মিলিত হুমকি ক্রমবর্ধমান হারে সমুদ্রসীমাতেও বাড়ছে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে (আইওআর) চীনের যু্দ্ধজাহাজগুলো নিয়মিত টহল দিচ্ছে। পাশাপাশি পাকিস্তানকেও সামুদ্রিক যুদ্ধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করছে তারা। ফলে, স্থল ও সমুদ্র সবদিকেই কোনঠাসা হয়ে পড়ছে ভারত।

ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, চীন ভারত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন স্থানে নৌ ঘাঁটি স্থাপণের পাশাপাশি পাকিস্তানের নৌবাহিনী নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তা করে যাচ্ছে। এই দ্বিমুখী তৎপরতার মাধ্যমে তারা অব্যাহতভাবে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, আগামী বছর পর থেকে পাকিস্তানকে আটটি ইউয়ান-শ্রেণির সাবমেরিন সরবরাহ করবে চীন। ডিজেল-বৈদ্যুতিন চালিত এই সর্বাধুনিক সাবমেরিনগুলোতে সর্বাধুনিক এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন প্রযুক্তি যোগ করা হয়েছে। যার ফলে এটি কম জ্বালানি খরচ করেও দীর্ঘ সময় পানির নীচে থাকতে ও বেশি দুরত্ব অতিক্রম করতে পারে।

স্টিলথ প্রযুক্তির এই সাবমেরিনগুলো শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে নিঃশব্দে আঘাত করতে সক্ষম। এ ছাড়াও আরও চারটি টাইপ-০৫৪এ মাল্টি-রোল স্টিলথ ফ্রিগেট এবং অন্যান্য নৌ সহায়তা ও অস্ত্রও সরবরাহ করবে চীন। এজন্য দুই দেশের মধ্যে ৭ বিলিয়নেরও বেশি ডলারের চুক্তি হয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৭০ শতাংশই করে চীন থেকে।

ভারতের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘চীন তার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলোর জন্য পাকিস্তানের করাচি ও গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়েদারের পাশাপাশি ২০১৭ সালে হর্ন অব আফ্রিকায় অবস্থিত জিবুতিতে তারা প্রথম নৌঘাঁটি স্থাপন করার পরে তারা এখন ভারত মহাসাগরে আরও সামরিক ঘাঁটির সন্ধান করছে।’

যদিও ভারত মহাসাগরে চীন ও পাকিস্তান উভয়ের থেকেই সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে ভারত। প্রয়োজন দেখা দিলে তারা মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মাঝখানে অবস্থিতি এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চীনের অধিকাংশ বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করে। মহাসাগরে ভারতের স্বাভাবিক অবস্থান এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তাদের ঘাঁটি গাড়ার সক্ষমতার কারণে চীনের সাথে কোন সঙ্কট বা যুদ্ধের সময়ে এই প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে ভারতীয় নৌবাহিনী।

তবে, মালাক্কা প্রণালীর কারণে ভারতের যে চীনের বিপরীতে একটা সুবিধা রয়েছে, সেটার কারণে বেইজিং এই জলপথকে এড়িয়ে যাওয়ার বিকল্প খুঁজে বের করছে। এ রকম একটি উপায় হলো পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর। চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের (সিপিইসি) অংশ হিসেবে বেইজিং গোয়াদরে এই বন্দরের উন্নয়ন করেছে যাতে স্থলপথে এখান থেকে চীনে পণ্য পরিবহন করা যায়। পাকিস্তান সরকার ৭.২ বিলিয়ন ডলারের রেলওয়ে প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে, যেটার মাধ্যমে গোয়াদর থেকে চীনের কাশগড় পর্যন্ত সংযুক্ত হবে।

চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি তীব্র গতিতে তাদের নৌ-শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। শুধুমাত্র গত এক দশকেই তারা কমপক্ষে ১১৭ টি বড় যুদ্ধজাহাজ বহরে যোগ করেছে। এটি এখন যে, ভারত মহাসাগরে চীনের বিমানবাহী জাহাজের প্রবেশ এখন সময়ের ব্যপার মাত্র।

ইতিমধ্যে, তাদের হাতে দুইটি বিমানবাহী জাহাজ রয়েছে, আরও দুটি নির্মাণাধীন রয়েছে। পাশাপাশি ৩৩ ডেস্ট্রয়ার, ৫৪ টি ফ্রিগেট, ৪২ টি করভেট, ৫০ টি ডিজেল-বৈদ্যুতিক ও ১০ টি পারমাণবিক সাবমেরিনসহ আরও বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। তারা যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াতে টাইপ-০৭৫ ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ডকসের মতো আরও বৃহত্তর উভচর যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে।

বিপরীতে, ভারতের নৌ-বহরে প্রায় ১৪০ টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিমানবাহী জাহাজ, ১০ টি ডেস্ট্রয়ার, ১৪ টি ফ্রিগেট, ১১ টি করভেটের পাশাপাশি ১৫ টি ডিজেল-বৈদ্যুতিন ও ২ টি পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন রয়েছে।

ভারতের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয়, পাকিস্তান নৌবাহিনীর চলমান আধুনিকায়ন। বিমান ও হেলিকপ্টার ছাড়াও বর্তমানে পাকিস্তানের হাতে ৯ টি ফ্রিগেট, ৫ টি সাবমেরিন, ১০ টি ক্ষেপণাস্ত্র জাহাজ এবং তিনটি মাইন সুইপার রয়েছে। এদিকে, ২০২১-২০২২ সালের মধ্যে তারা চীন থেকে ভূপৃষ্ঠ থেকে আকাশে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন টর্পেডো সজ্জিত চারটি নতুন স্টিলথ ফ্রিগেটস পাচ্ছে। এগুলোর পাল্লা ৪ হাজার নটিক্যাল মাইল।

একইভাবে, বিশ্বের সবচেয়ে নিঃশব্দ হিসাবে বিবেচিত ডিজেল-বৈদ্যুতিন শক্তি চালিত আটটি ইউয়ান-শ্রেণির টাইপ-০৩৯এ সাবমেরিন পাচ্ছে। এর প্রথম চারটি ২০২২-২০২৩ সালের মধ্যে পাকিস্তানে সরবরাহ করা হবে। অন্য চারটি করাচিতে নির্মিত হবে।

পাশাপাশি, পাকিস্তান তাদের পাঁচটি ফরাসী অ্যাগোস্টা-৯০বি সাবমেরিন আধুনিকায়নের জন্য তুরস্কের সাথে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। আপগ্রেডও করেছে। তারা তুরস্কের সাথে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় ২০২২-২০২৫ সালের মধ্যে মিলগেম-শ্রেণীর ৪ টি এন্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার করভেটসও পাবে। সমুদ্রসীমাতে উদীয়মান নতুন চীন-পাকিস্তান সম্মিলিত চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুতি নেয়া ছাড়া ভারতের জন্য আর কোনও বিকল্প নেই। সূত্র: টিওআই।

আরও সংবাদ

আফগান যুদ্ধের জন্য সংগ্রহ করা সাঁজোয়া যান বিক্রি করবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী

প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় আফগানিস্তানে যুদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত সাঁজোয়া যানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস করবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। চলতি মাসে প্রকাশিত এক পরিকল্পনায় বিষয়টি দেখা গেছে।

ব্ল্যাস্ট-প্রুফ এসব ট্রাক রাস্তার পাশে বিস্ফোরণ প্রতিরোধ করতে পারে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্রয় কর্মকর্তা জেরেমি বলেন, নতুন ল্যান্ড এনভাইরনমেন্ট অপটিমাইজেশন প্লানের আওতায় এসব ট্রাক সরিয়ে ফেলা হবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, বাহিনী থেকে প্রায় ৭৩৩টি যান সরানো হবে। এগুলো অন্য কোনো দেশের প্রতিরক্ষা সংস্থার কাছে বিক্রি করা হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ আফগানিস্তানে নতুন প্রশিক্ষিত সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত

ব্রিটেন তার বাহিনীর সুরক্ষার জন্য এ ধরনের হাজার হাজার যান কিনেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে আফগানিস্তানে তার সম্পৃক্ততার অবসান হলে এগুলোর ব্যবহার তেমন ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রে তৈরী হওয়া মাস্টিফ, রিজব্যাক ও ওলফহাউন্ড নামের এসব যান আকার ও অস্ত্র সজ্জায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নোটে বলা হয়, মাস্টিফ ভারী সাঁজোয়া যান। ১২ চাকার এই টহল যানে আটজন সৈন্য ও দুজন ক্রু বসতে পারে। ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম এ গাড়িতে ৭.৬২ এমএম জেনারেল পারপাস মেশিন গান, ১২.৭ এমএম ভারী মেশিন গান বা ৪০ এমএম অটোমেটিক গ্রেনেড লঞ্চার রয়েছে।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই তার বহর থেকে এ ধরনের প্রায় ২৮ শ’ যান সরিয়ে ফেলেছে।