আয়াসোফিয়াকে মসজিদ ঘোষণা : এরদোগানের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাল রাশিয়া

তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়া পুনরায় মসজিদ হিসেবে ঘোষণা করার পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে রাশিয়া। রুশ উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভেরশিনিন বলেছেন, এটি সম্পূর্ণ তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।

রুশ উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে সে বিষয়ে সম্যক অবহিত হয়েই বলতে চাই, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

তিনি এমন সময় এ বক্তব্য দিলেন যখন পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের পক্ষ থেকেও তুর্কি সরকারের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়েছে।

রুশ উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভেরশিনিন
এর আগে রাশিয়ার ভলোকলামস্ক শহরের অর্থোডক্স চার্চের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, আয়া সোফিয়া জাদুঘরকে মসজিদ হিসেবে ঘোষণা করা খ্রিস্টানদের মুখে চপেটাঘাতের শামিল।

তুরস্কের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের সূত্র ধরে দেশটির প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান গত শুক্রবার ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, আগামী ২৪ জুলাই এই ঐতিহাসিক স্থাপনা মুসলমানদের নামাজ আদায়ের জন্য খুলে দেয়া হবে। ইতিমধ্যেই আয়াসোফিয়ার জন্য ইমাম ও মুয়াজ্জিন নিয়গ দিয়েছে তুরস্কের ধর্ম মন্ত্রণালয়।

আয়াসোফিয়া মসজিদ নিয়ে পোপ ফ্রান্সিসের কিসের এতো চিন্তা?

৮৬ বছর পর পুনরায় মসজিদ হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়া নিয়ে ‘চিন্তিত’ পোপ ফ্রান্সিস।

একসময়ের মসজিদ আয়াসোফিয়াকে জাদুঘর থেকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরে তুরস্কের নেয়া সিদ্ধান্তে ‘খুবই কষ্ট’ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

রোববার খ্রিস্টান ধর্মের রোমান ক্যাথলিক শাখার প্রধান এই ধর্মগুরু এ ঘটনার নিন্দাও জানিয়েছেন।

ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে ভক্তদের উদ্দেশে দেয়া সাপ্তাহিক ভাষণে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, ‘ইস্তাম্বুল নিয়ে আমার চিন্তা হচ্ছে। আমি সান্তা সোফিয়ার চিন্তা করছি এবং আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি।’

এর আগে অমুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারাও তুরস্কের সরকারের নেয়া সিদ্ধান্তের নিন্দা জানায়।

ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অফ চার্চেস হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়্যিব এরদোগানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অর্থডক্স খ্রিস্টানদের আধ্যাত্মিক নেতাদের ইস্তাম্বুলভিত্তিক বৈশ্বিক সংগঠন প্যাট্রিয়ার্ক বার্থোলোমিউ তুরস্কের এই সিদ্ধান্তকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছে।

যদিও মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়্যিব এরদোগান আয়াসোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

তিনি সাফ বলে দিয়েছেন, ‘তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই।‘

আয়াসোফিয়া মুসলিম, খ্রিস্টান এবং বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে বলেও জানান এরদোগান।

৮৬ বছর পর পুনরায় মসজিদ হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়ায় আগামী ২৪ জুলাই নামাজের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।

শুক্রবার (১০ জুলাই) কামাল আতাতুর্কের সিদ্ধান্ত বাতিল ও আয়াসোফিয়া-কে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেশটির শীর্ষ আদালতের আনুষ্ঠানিক রায়ে দস্তখত করার পর তিনি একথা বলেন।

এদিকে, তুরস্কের ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়া মসজিদ নিয়ে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে ফের তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই মসজিদের ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে এ দু’দেশের মধ্যকার বিতর্ক অবশ্য এবারই প্রথম নয়। বহু দিন ধরে এ নিয়ে বিতর্ক চলে আসলেও নতুন করে তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মনে করা হচ্ছে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে গ্রিস এবার তুরস্কের সঙ্গে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ির চেষ্টা করবে।

বলা যায়, খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীদের মধ্যে একমাত্র গ্রিসই তুরস্কের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনায় সম্মুখ ফ্রন্টে অবস্থান করছে। বহু বিষয়ে গ্রিসের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। কিন্তু এবার ধারণা করা হচ্ছে গ্রিস সরকার ঐতিহাসিক আয়াসোফিয়া মসজিদ ইস্যুতে অভিযোগ উত্থাপন করে তুরস্কের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ ও বিদ্বেষ চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে।

আয়াসোফিয়া নির্মিত হয়েছিল ষষ্ঠ শতাব্দীতে, তখনকার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের নির্দেশে। চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ইউরোপের ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা এক অভিযান চালিয়ে কনস্টান্টিনোপল দখল করে তারা আয়া সোফিয়াকে অর্থডক্স গীর্জা থেকে ক্যাথলিক ক্যাথিড্রালে পরিণত করেছিল। এ নিয়ে খ্রিস্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের ঘটনার পর ১৪৫৩ সালে ওসমানীয় শাসনামলে এটিকে মসজিদে পরিণত করা হয়। সেসময় থেকে ১৯৩০ এর দশক পর্যন্ত এটি ছিলো মুসলিম বিশ্বের অন্যতম মসজিদ। এরপর তুরস্ক থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ণ করে দেওয়ার পর ১৯৩৫ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক এই মসজিদে নামাজ নিষিদ্ধ করে এবং আয়া সোফিয়াকে একটি জাদুঘরে পরিণত করেন।

তুরস্কের ইসলামপস্থীরা বহুকাল ধরেই চাইছিলেন এটিকে আবার মসজিদে পরিণত করতে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদলীয় এমপিরা এর বিরোধিতা করে আসছিলো। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আয়া সোফিয়াকে আবার মসজিদে পরিণত করার সমালোচনা করা হয়।তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বেশ কিছুকাল আয়া সোফিয়াকে আবার মসজিদে পরিণত করার কথা বলেন। গত বছর এক নির্বাচনী সভায় তিনি এই পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান। এ মসজিদটি নিয়ে বরাবরের মতোই এরদোগান সমালোচনার সম্মুখীন।