‘হারানো অতীতে আয়া সোফিয়া’ ——–উমর আলী।

ফিরলো আয়া সোফিয়া এ যেন সোনালী অতীতের চেতনার নবযাত্রা। রোমান সাম্রাজ্যের সাহিত্যে মননে আর যাপিত জীবনে আয়া সোফিয়া এক আবেগের নাম। বসফরাসের বহমান স্রোতের সাথে বদলেছে কেবল তার ধর্মীয় পরিচিতি কিন্তু তার লক্ষ্য তো সুদূরপ্রসারী । যার প্রমাণ আজকের তুরস্ক।

৯১৬ বছর গির্জা ৪৮২ বছর মসজিদ থাকার পর ১৯৩৪ সালে জাদুঘরে পরিনত করে কামাল পাশা। বর্তমান তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পূনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো আয়া সোফিয়া জাদুঘর থেকে মসজিদ। সত্যি নিজের সম্পদের হারানো অধিকার ফিরে পেলো তুর্কী মুসলমানরা।

পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চল শাসন করা বীর তুর্কীরা উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর অনেক উত্থান পতন পশ্চিমাদের নানাবিধ চুক্তির বেড়াজালে শৃঙ্খলিত হতে থাকে আজকের তুরস্ক, এখনো শেষ হয়নি ১৯২৩ সালের শতবছরের করা লুজান চুক্তি। আগামী ২০২৩ সালে শেষ হবে তুরস্কের উপর চাপিয়ে দেয়া অযাচিত এই চুক্তি।

যাই হোক সম্প্রতি ইউরোপ তথা মুসলিম বিশ্বের প্রথম নিউজগুলোর মধ্যে তুরস্কের আয়া সোফিয়া পুনরুদ্ধার। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, খোদ ওরিয়েন্টালিস্ট ও খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে, আয়া সোফিয়া ছিলো বাইজেন্টাইন সম্রাটের ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ। সাধারণ খৃষ্টানদের ওয়াকফকৃত সম্পদ ছিলো না সেটা। এ কারণেই সম্রাটকে পরাজিত করার পর এর মালিকানা পূর্ণরূপে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ এর নিকট চলে যায়।

আর সুলতান তার মালিকানাধিন এ সম্পদকে আল্লাহর ঘর মসজিদের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন। সময়ের কালক্রমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে কামাল পাশা সময়ের সাথে সাথে শাসন ব্যবস্থায় ঘটে ব্যাপক পরিবর্তন মসজিদগুলো পরিনত হয় জাদুঘরে। তারই ধারাবাহিকতায় জিঞ্জিরের শৃঙ্খলে আবদ্ধ আয়া সোফিয়া।

দীর্ঘ ৮৬ বছর ধরে যে স্থানটি থেকে মুসলমানদেরকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল সেটিকে পুনরায় ইবাদতের জন্য খুলে দেওয়ায় নিঃসন্দেহে তুর্কী সহ মুসলমানদের জন্য আনন্দের।

একসময় তুরস্কের ধর্মীয় নেতা বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীর আন্দোলনের ধারাবাহিকতার পথ ধরে পরবর্তীতে মিল্লিগুরুশের কিংবদন্তি নেতা নাজিমুদ্দীন আরবাকান আয়া সুফিয়ার পার্শ্বে দাড়িয়ে একদিন আয়া সুফিয়াকে মুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প ব্যাক্ত করছেন আর তারই সাগরেদ আজকের এরদোয়ান উপস্থিত জনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন সেই দিন আর বেশী দুরে নয়………. আসলেই তা সত্যি হলো।

তবে তুরস্ক এখন ১০০ বছর আগের মতো ইউরোপের কোন রুগ্ন দেশ নয় বা সেই নতজানু তুরস্ক নয়। যা দিনদিন প্রযুক্তি, সমর ও অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ এর লুজান চুক্তির মেয়াদ শেষ, শতবছরের গ্লানি ঘুচার অপেক্ষায় । তুরস্ক এখন ন্যাটোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে অধিকার খর্ব করার !!

আয়া সোফিয়া পুনরুদ্ধারের ঘটনায় খৃষ্টানদের বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কোন অধিকার খর্ব করা হয়নি।
উসমানীয় খেলাফতের সেই সময়ের কথা যেখানে ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ার নিজেই জানাচ্ছেন— আমরা যেমনটা ধারণা করি, উসমানিরা কখনোই খ্রিষ্টানদের প্রতি কোন ধরনের বৈষম্যমূলক কিংবা অসদাচরণ করেননি। বরং যেখানে ইউরোপ তার ভূখণ্ডে একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দিত না, সেখানে উসমানিরা গ্রীকদেরকে দিয়েছে ইচ্ছেমত গীর্জা-চার্চ নির্মাণ ও ধর্মপালনের অবারিত অধিকার।

অন্যদিকে বৃটিশ প্রাচ্যবিদ থমাস ওয়াকার আর্নল্ড তার বিখ্যাত বই ‘দ্য প্রিচিং অব ইসলামে’ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, বাইজেন্টাইন সম্রাটের অধীনে থাকা খ্রিষ্টানদের চেয়ে সুলতান মুহাম্মদের ছায়ায় বসবাস করা খ্রিষ্টানরা অধিকতর নিরাপত্তা ও সম্মানের জীবনযাপন করেছে।

বর্তমানেও কোন ধরনের নাগরিক বৈষম্য কিংবা অবিচারের সম্মুখীন তারা হয়নি।
“আয়া সোফিয়াকে কেন্দ্র করে মুসলিম–খ্রিস্টান ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করছেন এরদোয়ান”!!! আজকে যারা এসব বলছেন তারা কীসের সম্প্রীতির কথা বলছেন, যে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে মুসলিমদের যেভাবে সম্মানিত করেছেন এরদোয়ান, সেভাবে খ্রিষ্টানদেরও করেছেন।

তবে এ বিষয়ে তুরস্ক কর্তৃপক্ষ অন্যদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছে, আয়া সোফিয়ার ব্যবহার পরিবর্তন হলেও স্থাপনার বৈশিষ্ট্য সুরক্ষিত থাকবে। এই নীল মসজিদটি একইভাবে জনসাধারণের জন্য এবং সকল সম্প্রদায়ের দর্শনার্থী ও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুট কাভুসোগলু গত বৃহস্পতিবার বলেন, আয়া সোফিয়া মুলত কোনো আন্তর্জাতিক বিষয় নয়, এটি তুরস্কের জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়। আমাদের দেশের সাংস্কৃতি ও সম্পদের মতো আয়া সোফিয়াও তুরস্কের সম্পত্তি। এ থেকে আয়া সোফিয়া নিয়ে কারো মায়াকান্না কতটুকু যুক্তিসঙ্গত -!!

গত কয়েক বছরে জনসংখ্যার মাত্র ১ ভাগ খ্রিষ্টানের জন্য নির্মাণ করেছেন ৪৫০ টি নতুন গীর্জা। খ্রিষ্টান বিশপদের সাথে নিয়ে নিজে সেগুলোর উদ্বোধনও করেছেন তিনি। যেখানে ইউরোপের দেশে দেশে ইসলামফোবিয়া ছড়ানো হচ্ছে, এর বিপরীতে তুরস্কের কোনও একজন খৃষ্টান নাগরিক আজ পর্যন্ত নূ্ন্যতম বৈষম্যের স্বীকার হওয়ার রেকর্ড ইতিহাসে নেই।

গত ২৪ তারিখ শুক্রবার জুমআর নামাজের জন্য সকাল থেকে তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত ছিলো আয়া সোফিয়ার এলাকা তবে সবচেয়ে অবাক করা ও আর্শ্চযজনক বিষয় হচ্ছে জুমার খুতবায় খতীব সাহেব তলোয়ার হাতে খুতবা দিলেন। তাই বুঝি আশ্চর্য হচ্ছেন !!!

তরবারি তো আরবের নপুংসক শাসকরাও সাথে নিয়ে ঘুরে। আরব বেদুইনরাও প্রতীকী তরবারি বহন করে বেড়ায়। পুরান ঢাকার বাবার একমাত্র নাদুস-নুদুস ছেলেটাও বরযাত্রার সময় তরবারি ঝুলায়।

আসল কথা হলো, এই তরবারিকে পশ্চিমাশক্তি ভয় পায় না। তবে প্রতিকী তরবারি যদি মন্ত্রের প্রসঙ্গিকতায় চলে আসে সেটা ভাবার বিষয়। অনেকে দাবি করছেন এরদোয়ান বুঝি উসমানীয় খেলাফতের দিকে এগোচ্ছে !!!

আচ্ছা, একবিংশ শতাব্দীতে কি সেই আদলে আদৌ সম্ভব, আমার মতে, সম্ভব না। যদি এরদোয়ান করতে পারে সর্বোচ্চ খেলাফতের কিছু স্পিরিট তথা কিছু মূলধারার চিন্তাচেতনার উপকরণ। এছাড়া আর বেশি কিছু নয়। আমরা অপেক্ষায় থাকবো কোন পথে যাচ্ছে আগামীর তুরস্ক।