ভারত সীমান্তে চীন-যুক্তরাষ্ট্র লড়াই!

পাশ্চাত্যের বিশ্লেষকরা অব্যাহতভাবে যেটা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেটা হলো ১৯৬২ সালের ভারত আর ২০২০ সালের ভারত এক জিনিস নয়, এবং ১৯৬২ সালে তারা যেভাবে চীনের বিরুদ্ধে লড়েছিল, এখন তার চেয়ে জোরালোভাবে লড়তে পারবে।

এই তত্ত্বের সমর্থনে তারা শুধু সামরিক ডাটাই দিচ্ছে না বরং উদাহরণ হিসেবে ১৯৬৭ সালের সঙ্ঘাতকে হাজির করছে, যেখানে ভারতের চেয়ে বেশি সেনা হারিয়েছিল চীন।

কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের অর্থ হলো ১৯৬২ সালের মানসিক প্রভাব এখনও অনেক গভীর, এবং ১৯৬৭ সালের সঙ্ঘর্ষে সেই ক্ষত খুব একটা মেরামত হয়নি, যেমনটা পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা আশা করতে চায়।

তবে, পশ্চিমারা যেভাবে দেখছে, ভারতের সমস্যা হয়তো তার চেয়ে আলাদা। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হলো: ভারত আর চীন কি যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী, যেটা অনেকেই আশা করছে?

ইন্দো-চীন সঙ্ঘাতে লাভ হচ্ছে কার?

ভারতও চীনের মতোই যুদ্ধের হিসাব করে লাভ-ক্ষতি দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রও সেটাই করে। যুদ্ধ জনগণের মতামত পক্ষে আনতে সাহায্য করে এবং জনগণকে উজ্জীবিত করে। যেটা আশা করা হয়, সেটা হলো আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের তৎপরতা বাড়ানোর মাধ্যমে একটা জাতীয় উদ্দেশ্য হাসিল করা, যার মধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বাজার শেয়ারের বিষয়টিও রয়েছে।

চীন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রটাতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের এবং শেষ পর্যায়ে বৈশ্বিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে তাদের। এর অর্থ হলো চীন একটা ইঙ্গিতের ব্যবসার মধ্যে আছে। চূড়ান্ত যে ভোক্তাকে চীন হাতে আনতে চায়, সেটা হলো পশ্চিমা বিশ্ব। ভারতের বিরুদ্ধে কি করতে পারে, সেটা দেখানোর মাধ্যমে পশ্চিমাদের সেটাই দেখাতে চাচ্ছে চীন।

পশ্চিমাদের জন্য চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা একটা বড় লক্ষ্য। সে কারণে অভিন্ন শ্রেষ্ঠত্বের প্রস্তাবটা তারা অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। এখন যেটা হচ্ছে, সেটা হলো প্রক্সি সঙ্ঘাতের মাধ্যমে দর কষাকষি। এর অর্থ হলো আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের ক্ষেত্রে যুদ্ধের চেয়ে শান্তিকে এখন তুলনামূলক কম ফলদায়ক ভাবা হচ্ছে।

বড় ধরনের যুদ্ধগুলো থেকে খুব একটা ফল পাওয়া যায় না, ফল পাওয়া যায় হুমকি আর ছোট-খাটো সঙ্ঘাত থেকে। মেগা যুদ্ধগুলো ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় কারণ এখানে পারমাণবিকীকরণসহ বেশ কিছু ফ্যাক্টর জড়িত। সে কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মোটেই কাজ করেনি এবং ভিয়েতনামেও চীনের যুদ্ধ থেকে তেমন কোন অর্জন হয়নি। সে কারণে দূর থেকে ছোট-খোটো সঙ্ঘাত, যাতে চামড়া পুড়বে না, তেমনটাই এখন সবার পছন্দ।

কোভিড ফ্যাক্টর?

তবে, চীন নিশ্চিতভাবে অনেক বলিষ্ঠ মুডে রয়েছে। আর সেটার কারণ হলো অর্থনীতি আর কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনায় সাফল্য। মহামারী মোকাবেলায় পশ্চিমারা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র খুবই দুর্বল ব্যবস্থাপনা দেখিয়েছে। সে কারণে চীন তাদের সাফল্য নিয়ে তৃপ্তি অনুভব করলে তাদের দোষ দেয়া যায় না। ভারতও কোভিড নিয়ন্ত্রণে ভালো করেনি, এখনও করছে না, এবং চীন সেটা উল্লেখ করতে ইতস্তত করেনি। সাউথ এশিয়ান মনিটরে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি লেখায় কোভিড-১৯-এর দিকে চীনের ইঙ্গিতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য হলো ভারতের সার্বিক অদক্ষতার বিষয়টিকে তুলে ধরা। এটার ভাবার্থ করলে যেটা দাঁড়ায়, সেটা হলো: “কোভিডকেই যদি তোমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারো, তাহলে চীনা সেনাবাহিনীকে কিভাবে সামলাবে?”

এটা স্পষ্ট নয় যে, ভারত কেন সঙ্ঘাতটা বর্তমান পর্যায়ের উত্তেজনায় রাখতে চাচ্ছে। ভারত কোন বৈশ্বিক পরাশক্তি নয়, এ রকম ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাও তাদের নেই। এমনকি নয়াদিল্লীর আমলারাও মনে করেন না যে তারা বৈশ্বিক শক্তি। ভারতীয়রা যেটা চায়, সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পরাশক্তি বলয়ের অংশ হবে তারা। সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতার আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার কারণে ভারতকে দ্বিতীয় পর্যায়ের শক্তি হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তবে, এই প্রভাব পুরোটাই হবে অভ্যন্তরীণ কারণ এটা নিজেদেরকে একটা প্রধান শক্তি হিসেবে দেখাতে সাহায্য করে।

ভারতের হারানো উঠোন

ভারত নিজের চারপাশের উঠানো সবাইকেই মোটামুটি প্রতিপক্ষ বানিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তবে, সেটা হয়তো ভারতকে ভাবাচ্ছে না, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শক্তিগুলো তাদের সমকক্ষ নয়। পাকিস্তানের নাক রক্তাক্ত করে দেয়ার বিষয়টি আগের সেই জৌলুস হারিয়েছে এবং চীনকে সে ধরনের কিছু দিতে পারলে সেটা অনেক চিত্তাকর্ষক হবে। দেশের ভেতরে, জনগণকে দেখানো যাবে যে, ভারত এখন বড়দের সাথে লড়াইয়ের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

দেশের ভেতরে জনগণকে খাওয়ানোর জন্য এটা চটকদার সত্য। কিন্তু সামরিক শক্তি দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যাবে না, এ জন্য লাগবে অর্থনীতি। আর সেই জায়গাটাতে কোন অলৌকিকতা দেখা যাচ্ছে না ভারতের। চীনের অর্থনৈতিক স্ট্যাটাসের তুলনায় অনেক নিচে পড়ে আছে তারা। আসলে অর্থনীতির চেয়ে সামরিক ভারসাম্য বরং অনেক ভালো অবস্থায় আছে ভারতের। আর সঙ্ঘাতটা আসলে অর্থনৈতিক যুদ্ধের একটা প্রতিরূপ মাত্র, সামরিক যুদ্ধের নয়, কারণ সামরিক যুদ্ধে সেই অর্থে আসলে হয়-ই না।

ভারত এখন এমন একটা যুদ্ধে আটকা পড়েছে, যেখানে তাদের অর্জন খুবই সামান্য। পশ্চিমা-পন্থী বিশ্লেষকরা যদিও তথ্য দিয়ে বলার চেষ্টা করছে যে, সামরিক শক্তির দিক থেকে ভারত আর চীন কতটা কাছাকাছি, কিন্তু সীমান্ত যুদ্ধ থেকে কোন পক্ষেরই আসলে কোন অর্জন হবে না, এবং শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি হবে পুরনো স্থিতাবস্থায় ফিরে যাওয়া। আর যুদ্ধ যদি কিছুটা সময় দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ভারতের অর্থনীতির জন্য সেটা হবে অনেক বড় ক্ষতি। এ রকম একটা যুদ্ধ থেকে আসলেও ভারতের কিছু পাওয়ার নেই। চীনেরও অর্জনের খুব বেশি থাকবে না, তবে তাদের দুর্ভোগ হবে কম। যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে যে, ভারতের হাত ব্যবহার করে চীনকে ঘুষি দিয়ে রক্তাক্ত করবে তারা, কিন্তু ভারত তার হাতের ক্ষতি করতে চাইবে – এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

ভারত এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি এবং ভারতকে আঘাতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করছে চীন। ভারত চীনের প্রধান শত্রু নয় কারণ ভারতের বিরুদ্ধে কোন বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধে তারা লড়ছে না, লড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ভারত এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে গেছে এবং এ থেকে বের হতে পারছে না। বৈশ্বিক সঙ্ঘাতগুলো এখন চীন-ভারত সীমান্তের সঙ্ঘাতের মতো লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই পার করা হচ্ছে।

সূত্র : এসএএম