কাশ্মীরে ভারতের সীমাহীন নিপীড়ন

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের সপোর শহরে ১ জুলাই নিরাপত্তা বাহিনী ৬৫ বছর বয়স্ক বশির আহমদ খানকে তার গাড়ি থেকে টেনে বের করে তার ৩ বছরের নাতির সামনে গুলি করে হত্যা করে। দাদার বুকে শিশুটির বসে থাকার দৃশ্য কাশ্মিরিদের ক্রুদ্ধ করেছে।

তারা অভিযোগ করছে যে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র বশিরকে হত্যা করে স্বাধীনতাকামী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ক্রসফায়ারের কথা সাজিয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুটারেজের মুখপাত্র স্টেফেন দুজারিক ২ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে সপোরে নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেন এবং বলেন যে এ ধরনের কাজের জন্য যারাই দায়ী, তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

এই ঘটনা নিয়ে দুঃখ ও ক্রোধ বাড়রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নীরবই রয়ে গেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর ও বিশ্বের উদাসিনতার সুযোগ গ্রহণ করে ভারত রাষ্ট্র ৩০ হাজার ডোমিসাইল সার্টিফিকেট প্রদান করেছে (প্রধানত অমুসলিম অধিবাসীদের) জম্মু ও কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ত্বরান্বিত করার জন্য।

ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫ (ক) বাতিল করার মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদার অবসান ঘটানোর প্রায় এক বছর হয়ে গেছে।

কাশ্মিরে অমুসলিম বসতি স্থাপনের ভারতীয় পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ ও প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির চেয়ারম্যান ও অল পার্টিস হুরিয়াত কনফারেন্সের (এপিএইচসি) প্রধান ব্যক্তিত্ব মিরওয়াজ ওমর ফারুক বহিরাগতদের কাছে জমি বিক্রি না করার জন্য উপত্যকার অধিবাসীদের প্রতি অনুরোধ করেন।

তিনি বলেন, জমি বিক্রি করা হলে ভারত রাষ্ট্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাকে মুসলিম সংখ্যালঘু এলাকায় পরিণত করে ফেলতে পারবে।

এ ব্যাপারে প্রায় এক শ’ বছর আগের ফিলিস্তিনের কথা বলা যেতে পারে। জাতিপুঞ্জের ম্যান্ডেট পেয়ে ব্রিটেনের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ঢল নামে, তারা আরব অধিবাসীদের কাছ থেকে সম্পত্তি কিনতে থাকে।

যারা তাদের সম্পত্তি বিক্রি করতে অস্বীকার করেছিল, তারা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মদতপুষ্ট ইহুদি দখলদারিত্বের মুখে পড়েছিল। উসমানিয়া সাম্রাজ্যের আমলে ফিলিস্তিনিদের কথা মনে রাখা উচিত কাশ্মিরিদের।

১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার সময় ইহুদি জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৭ ভাগ। দুই দশকের মধ্যে তা বেড়ে হয় ৩০ ভাগ।

অধিকৃত কাশ্মিরের জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। নয়া দিল্লি যদি তার ডোমিসাইল নীতি পূর্ণ বাস্তবায়ন করে তবে মাত্র ১৫ বছরেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি মুসলিম সংখ্যালঘু রাজ্যে পরিণত হয়ে যাবে।

সপোরে ঠাণ্ডা মাথায় বশির আহমদ খানকে হত্যা করেই অধিকৃত কাশ্মিরে ভারতের সীমাহীন নৃশংসতা থামেনি। সময়ের পরিক্রমা তা বাড়তেই থাকবে। কারণ জম্মু ও কাশ্মিরে নয়া দিল্লির নৃশংস ও নির্দয় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দৃঢ় অবস্থান ছাড়া সারা দুনিয়া নীরব রয়েছে।

যদিও লাদাখে চীনের সাথে সঙ্ঘাতে ভারত নত হয়েছে, কিন্তু ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের অবৈধ পদক্ষেপের মাধ্যমে কাশ্মিরের ওপর তার প্রত্যক্ষ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করেছে।

তিনটি প্রধান কারণে কাশ্মিরি মুসলিমদের জন্য দোটানার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথমত, ৫ আগস্ট কাশ্মিরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসন বাতিল করার পর থেকে নিরস্ত্র কাশ্মিরিদের ওপর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতা ও নির্মমতা হ্রাস পায়নি। করোনাভাইরাসের কারণে চলতি বছর কাশ্মির লকডাউনে রয়েছে।

তবে কাশ্মির গত বছরের আগস্ট থেকেই লকডাউনে রয়েছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী নৃশংস ও নির্মম অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।

দ্বিতীয়ত, হতাশা, ক্রোধ ও প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে ভারতীয় বাহিনী মুসলিম কাশ্মিরিদের টার্গেট করছে। কারণ কয়েক মাস ধরে নির্যাতন ও নৃশংস নিপীড়ন সত্ত্বেও তারা উপত্যকাকে বশ মানাতে পারেনি। তাদের প্রতিরোধে দখলদার বাহিনীর মনোবল ভেঙে গেছে।

তৃতীয়ত, কাশ্মিরি মুসলিমদের দোটানা পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্কিত। কাশ্মিরিদের অধিকার ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রধান সমর্থকই হলো পাকিস্তান। কিন্তু ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের অধিবাসীরা হতবুদ্ধিকর অবস্থায় আছে।

এর কারণ হলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, বিশেষ করে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অপঃশাসন ও মন্থর অর্থনীতি। পাকিস্তান অভ্যন্তরীণভাবে স্থিতিশীল হলে তা কাশ্মিরিদের জন্য বিরাট সহায়ক হতো।

এই প্রেক্ষাপটে অধিকৃত কাশ্মিরে ভারতের সীমাহীন নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। কারণ পাকিস্তান বাস্তবে কাশ্মিরিদের সংগ্রামে সহায়তা করতে পারছে না। কাশ্মিরি সঙ্ঘাতের জটিল প্রকৃতিও আরেকটি সমস্যা।

কারণ কাশ্মিরের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে জম্মু ও লাদাখের অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা, উপত্যকায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা, আজাদ কাশ্মির ও গিলগিট-বাল্টিস্তানের বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না।

এখন পর্যন্ত ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে ভারতীয় নৃশংসতার বিষয়টি পাকিস্তান জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করেছে। কিন্তু যখন পাকিস্তানের পাইলটদের ভয়া লাইন্সের খবর ও অন্যান্য বিষয় ফাঁস, তখন যে নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে অবরুদ্ধ মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সহায়ক হয় না।